সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস
এদেশে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন সংগঠিত করার পাশাপাশি কমিউনিস্টরা প্রথম থেকেই নতুন ধারায় সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নেন। সাম্যবাদ শুধু মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিই নিশ্চিত করে না, পুরনো শোষণভিত্তিক সমাজের মূল্যবোধের পরিবর্তে মানুষকে শোষণহীন সমাজ গড়ে তোলার কর্মীতে রূপান্তরের ভেতর দিয়ে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের সৃজনীশক্তি বিকাশের পথও উন্মুক্ত করে দেয় এবং সৃষ্টি করে নতুন যুগের নতুন মানুষ। কমিউনিজম এজন্যই সবদিক থেকে মানব মুক্তির এবং মানস মুক্তির মতবাদ। মানুষের চিন্তাজগতের এই পরিবর্তন বা মুক্তবুদ্ধি ও মুক্ত জীবন-ভাবনা অবশ্য সহজ-সরল পথে আপনা থেকে গঠিত হয় না। সেজন্য প্রয়োজন পুরনো, পশ্চাৎপদ, রক্ষণশীল, সামন্তবাদী, পুঁজিবাদী ভাবধারার বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রাম।
কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীরা এই সংগ্রামে তৎকালীন বাংলাদেশে প্রথম থেকেই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বামপন্থি এই নবতরঙ্গের সাহিত্য প্রচেষ্টা ‘পরিচয়’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে তিরিশের দশকের শেষভাগে শুরু হয়। খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী মার্কসবাদী পণ্ডিত গোপাল হালদার, হীরেন মুখার্জী প্রমুখ এ ব্যাপারে সযত্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
হিটলারের নাৎসি বাহিনী কর্তৃক সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের পর সারা বাংলাদেশে ফ্যাসিবিরোধী লেখক সংঘ গঠিত হয়। এই সংগঠনের সঙ্গে তখন খ্যাতনামা কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী ছাড়াও সুপণ্ডিত আবু সয়ীদ আইয়ুব প্রমুখ অকমিউনিস্ট খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবীও যুক্ত ছিলেন।
সে সময় ঢাকায়ও ফ্যাসিবিরোধী লেখকদের সংগঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এই সংস্থার স্থানীয় শাখার সম্পাদক ছিলেন সোমেন চন্দ। সোমেন চন্দ ছিলেন ১৯ বছরের যুবক। এই বয়সেই তিনি কতকগুলো অদ্ভুত সুন্দর গল্প লিখে সারাদেশের পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সোমেন ছিলেন একজন প্রকৃত মার্কসবাদী সাহিত্যিক। নিজে ছিলেন স্থানীয় রেলওয়ে শ্রমিক সংগঠনের সম্পাদক। রেল শ্রমিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ভেতর দিয়ে তিনি মেহনতি মানুষের জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার জন্য সদা সচেষ্ট ছিলেন।
এই সময় পার্টি সারাদেশে ফ্যাসিবিরোধী মনোভাব গড়ে তুলবার জন্য ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলন অনুষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেয়। সারাদেশে ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি কমিউনিস্টদের এই প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করে, কমিউনিস্টদের ওপর হামলা চালায়, এমন কি তাঁদের খুন করতেও ইতস্তত করে না। হামলাকারীদের যুক্তি ছিল আমাদের সংগ্রাম ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। হিটলার-মুসোলিনি-তোজো ফ্যাসিস্টরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত, কাজেই ফ্যাসিস্টরা আমাদের মিত্র। তার ওপর তখন সুভাষ বসু জাপানের সহায়তায় আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছিলেন। কাজেই তাদের এই বিভ্রান্তি আরো দৃঢ়মূল হয়েছিল। অথচ তাদের এই যুক্তি ছিল মারাত্মক ভুল। ফ্যাসিস্টরা যদি সেদিন জয়লাভ করত, তাহলে সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট রূপ—ফ্যাসিবাদী চণ্ড শাসন ও শোষণ আরো দৃঢ়মূল হয়ে বসত।
যুদ্ধ-পরবর্তীকালে সারা বিশ্বে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রামের আজ যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে তা সম্ভব হতো না।
ঢাকার সূত্রাপুরে ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলন হওয়ার কথা। সোমেন চন্দ সেই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য রেলওয়ে কলোনি থেকে একটি মিছিল নিয়ে আসছিলেন। সে সময় ফ্যাসিবাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কর্মীরা লক্ষ্মীবাজারের কাছাকাছি সোমেন চন্দের মিছিলটির ওপর পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ করে এবং প্রকাশ্যে নিষ্ঠুরভাবে ছুরি ও শাবলের আঘাতে সোমেন চন্দকে হত্যা করে। আক্রমণের আকস্মিকতায় মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তারা সূত্রাপুর সম্মেলনও আক্রমণ করে। কিন্তু কমরেডদের জঙ্গি প্রতিরোধের জন্য তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সম্মেলনের বাইরে রাজপথে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে পুলিশের গুলিতে ফরওয়ার্ড ব্লকের একজন কর্মীও নিহত হন। নেত্রকোনায়ও ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাতে বঙ্কিম মুখার্জী, ভূপেশ গুপ্ত, জ্যোতি বসু, মণিকুন্তলা সেন প্রমুখ প্রাদেশিক নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেছিলেন।
শুধু ঢাকা নয়, পূর্ববাংলার বিভিন্ন জায়গায় সে সময় উগ্রনীতির কারণে ফ্যাসিবাদীদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দ্বারা আমাদের বহু কমরেড নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন। ময়মনসিংহে নিহত হয়েছিলেন উদীয়মান কর্মী ফণী চক্রবর্তী, ভানু মজুমদার ও গোপাল নাগ। এটা ঘটেছিল
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments